ব্যাংক খাত

৫ বছরে ইস্যুকৃত কার্ড ১২৭% বাড়লেও গড় লেনদেন বাড়েনি হাজার টাকা

প্রতি বছর নগদ টাকা ছাপানো ও বিতরণে দেশে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়।

প্রতি বছর নগদ টাকা ছাপানো ও বিতরণে দেশে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। এ ব্যয় কমাতে ডিজিটাল তথা নগদবিহীন লেনদেন নিয়ে আলোচনা চলছে বহুদিন ধরেই। লেনদেন সহজ করতে ব্যাংকগুলোও ইস্যুকৃত কার্ডের সংখা বাড়াচ্ছে। তবে কার্ডধারীর সংখ্যা বাড়লেও সে অনুপাতে বাড়ছে না লেনদেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত ৫ বছরে কার্ডের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১২৭ শতাংশ। তবে কার্ডপ্রতি গড় লেনদেন বাড়েনি ১ হাজার টাকাও। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কার্ডধারীর সংখ্যা বাড়লেও দেশে এখনো ডিজিটাল লেনদেনের অবকাঠামো তৈরি না হওয়ায় কার্ডভিত্তিক লেনদেন বাড়ছে না।

দেশে সাধারণত ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড এ তিন ধরনের কার্ড ইস্যু করে ব্যাংকগুলো। সম্প্রতি দেশ-বিদেশে এসব কার্ড ব্যবহারের ধরন নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে দেখা যায়, ২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ইস্যুকৃত কার্ডের পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৩২ লাখ ৭২ হাজার ১৮৫টি। ওই মাসে এসব কার্ড দিয়ে ১৮ হাজার ৯২৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা লেনদেন করা হয়েছিল। কার্ডপ্রতি গড় লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ১৩২ টাকা। ৫ বছর পর চলতি বছরের অক্টোবরে এসে দেশে ইস্যুকৃত কার্ডের সংখা দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ২৮ লাখ ১৮ হাজার ৩৮৬টিতে। ওই মাসে কার্ডের মাধ্যমে মোট লেনদেন হয়েছে ৪৭ হাজার ৮৫৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা। কার্ডপ্রতি গড় লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৬১ টাকায়। এ হিসেবে গত পাঁচ বছরে দেশে কার্ডপ্রতি গড় লেনদেন বেড়েছে মাত্র ৯২৯ টাকা।

ডিজিটাল লেনদেনে মানুষের মনে এখনো ভীতি আছে বলে মনে করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ এখনো কার্ডভিত্তিক লেনদেনে ভয় পায়। এজন্য তারা নগদ লেনদেনকে বেশি নিরাপদ মনে করে। ট্যাক্স ইস্যুসহ নানা কারণেই ডিজিটাল লেনদেনের সম্প্রসারণ হচ্ছে না। এজন্য সবার আগে মানুষের মনের ভয় কাটিয়ে তুলতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা দেখছি, ব্যাংক খাতে কার্ডের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু সংখ্যার প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে লেনদেন বাড়ছে না। ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর জন্য যে ধরনের অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন সেটিও হয়নি। কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেনকে জনপ্রিয় করা যায়নি। এটি করার জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। এক্ষেত্রে ব্যাংকারদের পাশাপাশি সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে।’

গত পাঁচ বছরে ব্যাংক খাতে কার্ডের সংখ্যা প্রতিনিয়তই বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে দেশের ব্যাংক খাতে ইস্যুকৃত কার্ড ছিল ২ কোটি ৮২ লাখ। ২০২২ সালে তা বেড়ে ৩ কোটি ৫৩ লাখ, ২০২৩ সালে ৪ কোটি ২০ লাখ ও ২০২৪ সালে ৪ কোটি ৯৭ লাখে উন্নীত হয়। সবশেষ চলতি বছরের অক্টোবরে দেশের ব্যাংক খাতে ইস্যুকৃত কার্ডের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ২৮ লাখ ১৮ হাজার ৩৮৬টিতে। এর মধ্যে সবেচেয়ে বেশি বেড়েছে ডেবিট কার্ড। বর্তমানে বাজারে ইস্যুকৃত এ কার্ডের সংখ্যা ৪ কোটি ৬ লাখ ৪৫ হাজার ৩৪৫টি। ক্রেডিট কার্ড রয়েছে ২৮ লাখ ৩৫ হাজার ১৮৪টি। পাঁচ বছরের ব্যবধানে ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের প্রবৃদ্ধি হয়েছে যথাক্রমে ৯৪ ও ৭৬ শতাংশ।

ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের প্রবৃদ্ধির গতি স্বাভাবিক থাকলেও প্রিপেইড কার্ডের প্রবৃদ্ধিতে দেখা গেছে উচ্চ উল্লম্ফন। গত পাঁচ বছরে ইস্যুকৃত এ ধরনের কার্ডের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১ হাজার ২৫৮ শতাংশ। ২০২০ সালের নভেম্বরে দেশে প্রিপেইড কার্ডধারীর সংখ্যা যেখানে ৬ লাখ ৮৭ হাজার ৭১৮ ছিল, ২০২৫ সালের অক্টোবরে এ সংখ্যা ৯৩ লাখ ৩৭ হাজার ৮৫৭-এ দাঁড়িয়েছে।

মাস্টারকার্ড বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বলেন, ‘প্রিপেইড কার্ডের ধারণাটি বাংলাদেশে খুব বেশি পুরনো নয়। এ কার্ডে আগে টাকা রেখে পরে খরচ করতে হয়। এছাড়া প্রিপেইড কার্ড সাধারণত নতুন গ্রাহকরা নিয়ে থাকেন। প্রিপেইড কার্ড বাদ দিয়ে যদি আমরা কেবল ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের লেনদেনের ধরন দেখি, তাহলে গ্রাহকরা আগের তুলনায় বেশি লেনদেন করছেন। মানুষ আগে ডেবিট কার্ড দিয়ে কেবল এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলত। কিন্তু এখন দেশে-বিদেশে কেনাকাটাও করে। তবে সামগ্রিকভাবে এখনো বাংলাদেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় ডিজিটাল লেনদেন অনেক কম। ইস্যু করা অনেক কার্ড এখন হয়তো আর সক্রিয় নেই। সক্রিয় থাকা কার্ডের লেনদেন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন পাঁচ বছরের তুলনায় অনেক বেড়েছে।’

আরও